লেখক পরিচিতি
পারিবারিক
নাম মোহাম্মদ আবদুল জলিল। বরিশাল জেলার উজিরপুর থানায় জন্ম। পিতা জনাব আলী চৌধুরীর মৃত্যুর ৩মাস পরে উজিরপুর সদরেই অবস্থিত মামার বাড়ীতে জন্ম। শিশুকাল এবং কৈশোর মামদের পরম স্নেহেই কাটে। উজিরপুরের W.B. UNION INSTITUTION থেকে কৃতিত্বের সংগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এ সময়ে ‘পথের কাঙাল’ এবং ‘রীতি’ নামক দু’খানা উপন্যাস রচনা করেন। পরে পান্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৬১ সনে ‘Y’ Cadet স্কীমের অধীনে পশ্চিম পাকিস্তানের ‘মারী হিলস’(রাওয়ালপিন্ডি জেলায়) ভর্তি হন। কৃতিত্বের সংগে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীন্ন হন। ১৯৬৩ সনে পাকিস্তানী মিলিটারী একাডেমী কাকুলে সামরিক বাহিনীর অফিসার কাম ট্রেনিং- এ যোগদান করেন। ১৯৬৫ সনের সেপ্টেম্বর মাসে কমিশন প্রাপ্ত হয়ে ১২ নং ক্যাভালরী রেজিমেন্ট (ট্যাঙক বাহিনী) যোগদান করেন।
১৯৯৬৫ সনের যুদ্ধে অংশগ্রহন। যুদ্ধে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। যুদ্ধ বিরতির পরে ৬৬সনে পাকিস্তানের মুলতান শহরে ১ম ট্যাংক ডিভিশনে চলে আসেন। পাকিস্তান একাডেমী থেকে গ্রাজুয়েশন এবং পরবর্তীতে মুলতানে বসে পুনরায় গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী এবং জেনারেল হিসট্রিতে মাষ্টার ডিগ্রী অর্জন করেন। মুলতানে থাকাকালীন ট্যাংক ব্রিগেড এবং ট্যাংক ডিভিশনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সনের ১০ই ফেব্রুয়ারী ১ মুসের ছুটি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন অসুস্থ মাতাকে দেখতে। সেই অবস্থায়ই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন এবং বৃহত্তম সেক্টর নবম সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন।
যুদ্ধের পরে ভারতীয়
সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সম্পদ লুন্ঠনের প্রতিবাদ করায় বন্দী হন। তিনিই বাংলাদেশের সর্ব প্রথম রাজবন্দী। ১৯৭২-এর সেপ্টেম্বরে মুক্তিলাভ করে ৩১ শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন। তিনি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪-এর মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের দু:শাসন এবং ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম করেন। ১৭ই মার্চ ১৯৭৪ আওয়ামী লীগের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাড়ী ঘেরাও করেন। ওখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বন্দী হন। পাঠানো হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। মুক্তি পান ৮ই নভেম্বর ১৯৭৫ সনে। ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের নেপথ্য অন্যতম নায়ক তিনি। ২৩ শে নভেম্বর ১৯৭৫-এ পুনরায় জিয়া সরকারের হাতে বন্দী হন। তাঁর বিরুদ্ধে য়ড়যন্ত্র মামলা দাঁড় করানো হয়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্নেল আবু তাহের সহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী উসকিয়ে ক্ষমতা দখলের য়ড়যন্ত্র অভিযোগে গোপনে স্পেশাল মিলিটারী ট্রাইবুনালে বিচার শুরু হয়। ১৯৭৬-এর ১৮ই জুলাই বিচারের রায়ে কর্নেল তাহের এবং তার ফাঁসির হুকুম হয়। সাথে সাথেই মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের কারণে জলিলের ফাঁসি মওকুফ হয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। ১৯৮০ সনের ২৬শে মার্চ গণ-আন্দোলনের দাবীতে তিনি মুক্তি পান। ১৯৮১ সনের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিন দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে(জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং কৃষক-শ্রমিক সমাজবাদী দল) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর পূর্বে ১৯৭৩ সনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সহ আরো ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিজয়ী ঘোষণা করার পরেও তাকে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে পরাজিত ঘোষণা করা হয়। আদর্শগত পার্থক্যের কারণে ১৯৮৪ সনের ৩রা নভেম্বর তিনি জাসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৮৪ সনের ২০শে অক্টোবর তারিখে ইসলামী আন্দোলন হিসেবে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ ঘোষণা করেন। ২১শে অক্টোবর জনাব হাফেজ্জী হুজুর সহ ১১টি ইসলামী সংগঠন সহকারে ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে দেশ ব্যাপী ইসলামী আন্দোলন শুরু করেন। বর্তমান সরকার বিরোধী আন্দোলনে শরীক হওয়ার ফলে ১৯৮৫ সনের জানুয়ারী মাসে ১ মাস গৃহ বন্দী ছিলেন। পুনরায় ১৯৮৭ সনের ৩০শে ডিসেম্বর হ’তে ১৯৮৮ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা কারাগারে বিশেষ আইনে নিরাপত্তা বন্দী হন। মেজর জলিল ‘সীমাহীন সমর’ ‘মার্কসবাদ’ এবং সূর্যোদয়’ সহ কয়েকটি ইংরেজী গ্রন্থেরও প্রণেতা। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহন করেছেন। ১৯৮১ সনের আগস্ট ত্রিপলতে, ১৫ই আগস্ট তারিখে লেবাননে, ১৯৮৫ সনের আগস্টে লন্ডনের মুসলিম ইন্স্টিটিউটে, ৮৬ সনের এপ্রিল মাসে ত্রিপলীতে; ১৯৮৬ সনের আগস্টে পুনরায় মুসলিম ইন্স্টিটিউট লন্ডনে এবং ১৯৮৭-র নবেম্বরে তেহরান আন্তর্জাতিক ইসলামিক কনফারেন্সে যোগদান করেন।
গত ১৯৮৯ সনের ৬ই নভেম্বর তিনি একটি ব্যক্তিগত সফরে পাকিস্তান গমন করেন এবং ১১ই নভেম্বর ইসলামাবাদ পৌঁছেন। সেখানে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভর্তি হন এবং ১৯শে নভেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে এগারটায় ইন্তেকাল করেণ । তিনি কার্ডিও পালমোনারীতে আক্রন্ত হয়েলিলেন। তার মৃত্যূর খবর ঢাকায় পৌঁছার সাথে সাথে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার লশ ২২শে নবেম্বর ঢাকা পৌঁছলে দুপুরে বায়তুল মোকাররম মসজিদে নামাজে জানাজার পরে মীরপুর নব প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা’ গোরস্তানে সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। উল্লেখ্য মেজর (অবঃ) জলিলই সে সৌভাগ্যবণ ব্যক্তি যার লাশ দাফনের মাধ্যমেই মীরপুরের মুক্তিযোদ্ধা গোরস্তানে সর্ব প্রথম লাশ দাফন শুরু হয়েছে।
মরহুম মেজর (অবঃ) এম,এ, জলিল মাতা, স্ত্রী ও দুটি কন্যা সন্তান রেখে গিয়েছেন।
অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা
অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা pdf বই ডাউনলোড। শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের এই ভুখন্ডে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের স্ব স্ব ধর্ম-কর্ম, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠানসহ মোটামুটি শান্তিপুর্ণ ভাবে সহাবস্থান করে এসেছে। এই সাহবস্থানমূলক বসবাসের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ গড়ে তুলেছে সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য। তবে যুগে যুগে এই ভূখন্ডের জনগণ বিদেশী শাসক-শোষকদের হাতে শোষিত, নিপীড়িত এবং লুন্ঠিত হয়েছে।ব্রিটিশ- শাসক-শোষকদের সুদীর্য দুশো বছরের ঘোষণ এখনো অনেকের স্মৃতিতে দুঃস্বপ্নের মতেই জেগে আছে। একইভাবে হিন্দু ব্রাক্ষণ্যবাদ এবং জালেম জমিদারী প্রথার মাধ্যমেও নিষ্পষিত হয়েছে এই ভুখন্ডের শান্তিপ্রিয় জনগণ।
সর্বশেষে, ভারত বিভক্তি এবং তারই ফলশ্রুতিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্টের ভিত্তিতে পাকিস্তান অর্জন। ব্রিটিশ রচিত ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রয় কাঠামো বহাল রেখে পাকিস্তানের উঠতি পুজিঁবাদী গোষ্ঠী বিশেষ করে সামরিক এবং বেসামরিক আমলা গোষ্ঠী এই অঞ্চলের জনগনের উপর বিমাতসুলভ আচরণ এবং শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে।
যার ফলে এই অঞ্চল থেকে যায় অনগ্রসর, অবহেলিত এবং নিগৃহীত । জনগণের অভাব-অনটন, হতাশা ও ভিক্ষোভ ক্রমশই পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ধুমায়িত হতে হতে ১৯৭১ সনে একটি প্রবলে আগ্নেয়গিরির মতই উদগীরণ ঘটে। এই উদগীরণই পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়।
১৯৭১ সনের স্বাধীনাত সংগ্রাম হচ্ছে বাঙ্গালী জাতির ধারাবাহিক মুক্তি আন্দোলনেরই একটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং সক্রিয় রূপ। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালী জাতি দেশি-বিদেশী শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে নিরবচ্চিন্নভাবে লড়াই করে এসেছে-কখনো করেছে সংঘবদ্ধভাবে, কখনো বা বিচ্ছিন্নভাবে।
কিন্তু এই জাতির বিকাশের ইতিহাসে কোনকালেই সংগ্রামী জনগণ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায়নি। নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের মধ্যে লালিত মুক্তিপাগল বাঙ্গালী জাতি সর্বযুগেই শোষকদের কবর রচনা করে এসেছে।
