বয়কট ইন্ডিয়া BOYCOTT INDIA
কয়েকদিন ধরে কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ ট্রেন্ড চলছে। দেশগুলোর কোন কোন সুপার মার্কেট থেকে ভারতীয় পণ্য সরিয়েও ফেলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত হিন্দু ভারতীয়দের সেখান থেকে ফেরত পাঠানোর কথাও উঠতে শুরু করেছে। হিন্দুত্ববাদি ভারতের শাসকদল বিজেপি’র অফিসিয়াল মুখপাত্র নুপুর শর্মা আমাদের মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা: আ:) সম্পর্কে অত্যন্ত গর্হিত ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার প্রতিক্রিয়ায় কাতার এবং কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের ডেকে নিয়ে অবিলম্বে ভারত সরকারের ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র দফতর কুৎসার নিন্দা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে। ইরান এবং আফগানিস্তানও প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। ভারতে মুসলমানদের উপর বছরের পর বছর ধরে চলা আমানবিক নির্যাতন নিয়ে দীর্ঘদিন নিরব থাকার পর ওআইসি বিবৃতি দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রায় দশ দিন ধরে ভারতীয় মুসলমানদের চলমান প্রতিবাদকে কোনরকম পাত্তা না দিলেও আরব দেশগুলো সোচ্চার হয়ে ওঠায় শেষ পর্যন্ত দিল্লির টনক নড়েছে। বিজেপি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অতি ঘনিষ্ঠ নুপুর শর্মাকে আপাতত: দল থেকে অব্যাহতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।ভারতে ইসলামোফোবিয়া নতুন কোন ব্যাপার নয়। বর্তমান বিশ্বে ইসলাম বিদ্বেষের মাপকাঠিতে দেশটি সবার উপরে। যায়নিস্ট ইসরায়েলও ইসলামবিদ্বেষী। তবে ইসলাম এবং ইহুদি, উভয় ধর্মই একেশ্বরবাদি হওয়ায় ধর্ম হিসেবে ইসলামের প্রতি ঘৃনার তীব্রতা হিন্দুদের তুলনায় ইহুদিদের মধ্যে কিছুটা কম। ইসরায়েলে ঘৃনা এবং আক্রোশের মূল টার্গেট প্যালেস্টাইনিরা। ইসলাম ধর্ম দুই নম্বরে। অপরদিকে পৌত্তলিক ভারতে ইসলাম ধর্মই প্রধান টার্গেট, তারপর সে দেশের সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠী। হিন্দু এবং ইহুদিদের সাথে মেলামেশা করলে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই সুক্ষ্ম পার্থক্য সহজেই ধরতে পারবেন। ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ার পোষ্টগুলো পড়লেও ইসলামের প্রতি হিন্দুদের প্রবল ঘৃনা ও জিঘাংষার ভয়ংকর মাত্রা টের পাওয়া যায়। বংলাদেশে হিন্দুপ্রেমিরা সাফাই গেয়ে সচরাচর বলে থাকেন যে, অশিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যেই কেবল এই জাতীয় ঘৃনা রয়েছে, শিক্ষিত হিন্দুরা ধর্মের বিষয়ে খুবই উদার। এটা একেবারেই ভুয়া কথা। ভারতে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত হিন্দুদের মধ্যেই ইসলামোফোবিয়া সবচেয়ে তীব্র। ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রধান ভোটব্যাংক হলো এই শিক্ষিত হিন্দু জনগোষ্ঠী। অবশ্য দক্ষিণ ভারতের জনগণ এদিক দিয়ে যথেষ্ট ব্যতিক্রম। একমাত্র কর্ণাটক ছাড়া অন্য কোন দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যে হিন্দু চরমপন্থী দল বিজেপি এখন পর্যন্ত নির্বাচনে জিততে পারে নাই।
১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার মধ্য দিয়েই ভারতে হিন্দু চরমপন্থার উত্থান প্রধানত: শুরু হয়। এরপর ২০০৪ সালে গুজরাট দাঙ্গায় রাজ্যটির তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রি নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে, ‘গুজরাটের কসাই মোদি’ জাতীয় বীরে পরিণত হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি জয়লাভ করলে ভারত নাজি জার্মানীর আদলে একটি হিন্দু ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করবার জন্য মোদি ভারতের সংবিধানে ‘সেক্যুলারিজম’ নামেমাত্র রেখে দিলেও প্রকৃতপক্ষে গত আট বছরে ভারতীয় মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। তাদের উপর অব্যাহত নির্মম নির্যাতনের প্রেক্ষিতে বিশ্বের অনেক প্রখ্যাত স্কলার এবং বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইন্ডিয়ায় যে কোন মুহূর্তে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যা আরম্ভ হতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশটিতে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ চললেও, আন্তর্জাতিক মহল কেবল নিরবই থাকেনি, অধিকন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সব বিশ্ব-মোড়লরা মোদিকে প্রকারান্তরে অন্ধ সমর্থন জুগিয়েছে। ইসলাম এবং চীনকে মোকাবেলা করবার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব চরম আধিপত্যবাদি ভারতকে এই অঞ্চলে তাদের কৌশলগত মিত্র বানিয়েছে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশসমূহ অর্থনৈতিক স্বার্থকে আগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ইসলামের মর্মবাণী, উম্মাহ’র প্রতি দায়িত্ববোধের কথা একেবারে ভুলে গেছে। অসহায় ভারতীয় মুসলমানদের রক্তে যার হাত রঞ্জিত সেই সন্ত্রাসী মোদিকে আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরায়েন নানারকম রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার দিয়ে সন্মানিত করেছে। এর ফলে ক্রমেই ভারত সরকার আরো দুর্বিনিত আচরণ করেছে।
বিলম্বে হলেও মুসলিম বিশ্বের ঘুম অবশেষে ভেঙেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অবশ্য ব্যতিক্রম এখনও আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলী প্রভাব বলয়ের আমিরাত এখনও নীরব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে যে, সকল আন্তর্জাতিক বিষয়েই মুসলিম বিশ্বের তুলনায় আমিরাত বরঞ্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ভারতের স্বার্থ রক্ষাতেই অধিকতর উৎসাহী থাকে। বিশেষত: দুবাইতে ভারতীয়দের প্রচন্ড প্রভাব রয়েছে। বলিউডের সকল তারকারই ‘সেকন্ড হোম’ এখন দুবাই। সেখানকার অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদ ভারতীয় হিন্দুরাই দখল করে আছে। অপরদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ভারতের অঘোষিত উপনিবেশ হওয়ায় সেই দেশটির সরকার মহানবীর অপমানের বিষয়ে আমিরাতের মতই নীরবতা পালন করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রায় নব্বই ভাগ জনগণ মুসলমান ধর্মাবলম্বী হলেও রাষ্ট্র মুলত: হিন্দুরাই চালাচ্ছে। পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপদে হিন্দুদের একচেটিয়া প্রাধান্য রয়েছে। নিজদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অবস্থা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের অনুরূপ। ভারতে মুসলমান যেভাবে নিগৃহিত হচ্ছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার চাইতে ভিন্ন কিছু নয়। দিল্লির বিরুদ্ধে কোনরকম প্রতিবাদের অধিকার বাংলাদেশের মুসলমানদের নাই। তদুপরি, দেশটিতে একটি চরম ইসলামবিদ্বেষী, ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকায় জনগণের পক্ষে কোন গণতান্ত্রিক আন্দোলন করাও সম্ভব নয়।
যাই হোক, আমরা আশা করি যে, মুসলিম বিশ্বে #বয়কট ইন্ডিয়া ট্রেন্ড ক্রমেই বেগবান হয়ে একটি সার্বজনীন আন্দোলনে রূপ নেবে। কোন মুসলমানের মনে যদি বিন্দুমাত্র ঈমান অবশিষ্ট থাকে তাহলে সে ভারতের এই ঔদ্ধত্যকে ক্ষমা করবে না। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
