মাথায় পাতলা সাদা কাপড়ের কিস্তি টুপি, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা, গায়ে পাঞ্জাবি আর হাতে একটি ব্যাগ। ব্যাগের মধ্যে কিছু জরুরী কাগজ পত্র আর কয়েকটি শুকনো রুটি নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলছেন সাদিক সাহেব রেলস্টেশনের দিকে। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে, তিনি উঠে নিজের সিটে বসতেই পং... পং... বাঁশি বাজিয়ে দোলে উঠলো ট্রেন।
প্রায় তেরো বছর আগের দেয়া ওয়াদা রক্ষা করতে অসুস্থ শরীর নিয়েই রওয়ানা হলেন। সিটে বসে বসে অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করতে লাগলেন চোখ বন্ধ করে । কত দ্রুত দিন চলে যায়...। ভাবতে ভাবতে ফিরে গেলেন পঁচিশ বছর পেছনে।
১৯২০ সাল। বৃটিশ শাসনের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত স্ট্যাট অব ভাওয়ালপুর ছিলো একটি দেশীয় রাজ্য। স্যার পঞ্চম সাদিক মুহাম্মদ খান আব্বাসী এই রাজ্যের নবাব।
রাজ্যের আহমদপুর তালুকের এলাহী বখশের মেয়ে আয়শা। সমবয়সী মেয়েদের নিয়ে খেলাধুলা আর পুতুল বিয়ে দিয়ে কেটে যায় তার দিন। মাঝে মধ্যে মায়ের সাথে সংসারের কাজেও হাত লাগায়। এভাবেই বেড়ে উঠছিলো গ্রামের মেয়ে আয়শা।
এদিকে বাবা এলাহী বখশ তার জন্য পাত্র ঠিক করে রেখেছেন। আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, ছেলেও দেখতে শুনতে মাশাআল্লাহ, নাম আবদুর রাজ্জাক। আয়শাও ভালো ঘরের মেয়ে, তাই উভয় পক্ষ সম্বন্ধটা পাকাপোক্ত করে রাখতে চায় বিলম্ব না করে। অবশ্য এখন শুধু এঙ্গেজমেন্ট করে রাখবে, পরে মেয়ে একটু শেয়ান হলে ঘরে তুলে নিবে।
দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটি বছর কেটে গেছে। আয়শাও আর সেই ছোট্টটি নেই। ঘরের কাজে খুব পটু আর বুদ্ধিমতী। ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছে। বর পক্ষ কিছুদিন পরপর তাদের ‘ঘরের বউ’ ঘরে তুলে দেয়ার তাগাদা দেয়।
বাবা কয়েকদিন ধরে মেয়ের সাথে কথা বলবেন বলবেন করে আর বলা হচ্ছে না। একদিন দুপুর বেলা খেতে বসে কথায় কথায় আয়শাকে একথা বলতেই মুখের ওপর ‘না’ বলে দেয়! “ঐঘরে যাওয়া আমার জন্য কিছুতেই সম্ভব নয় বাবা।”
আয়শা তার বাবাকে সবকিছু খুলে বলে। এই কয়বছরে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। আবদুর রাজ্জাক আর আগের মত নেই। সে তার ধর্ম বদলে ‘আহমদী’ হয়ে গেছে। সে এখন কাদিয়ানের গোলাম আহমদকে নবী মানে, গোলাম আহমদের ছেলে মির্জা বশিরকে নবীর খলিফা বলে দাবি করে। একজন মুসলিম হয়ে কিভাবে আমি তার ঘর করতে পারি!
আয়শার বাবা ভালো করে খবর নিয়ে দেখলেন মেয়ের কথা মিথ্যে নয়। তিনি লোক পাঠিয়ে বর পক্ষের কাছে খবর পাঠিয়ে দিলেন “আপনাদের বাড়িতে আমার মেয়ে যাবে না।”
অপরদিকে বর পক্ষ জেদ ধরলো। তারা জানিয়ে দিলো,পুরো গ্রাম সাক্ষী রেখে বিয়ে হয়েছে, মেয়ে দিবে না বললেই হলো নাকি! কাগজপত্রে সে এখন আমাদের ঘরের বউ। এনিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে ভালোই ঝগড়া বসচা শুরু হলো।
১৯২৬ সালের ২৪ জুলাই। আয়শার বাবা এলাহী বখশ সাহেব ডিভোর্সের জন্য থানায় একটি মামলা দায়ের করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ালো।
৭ মে ১৯২৭ ঈ.। প্রায় এক বছর শোনানির পর স্থানীয় জেলা জজ আদালত রায় দিলো যে, ইসলামি আইন মোতাবেক এবিয়ে বৈধ, তবে এখানে যেহেতু নতুন আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, মামলার বিবাদী ‘গোলাম আহমদ’কে নবী বলে মনে করেন। তাই দেখতে হবে এর ইসলামি হুকুম কি এবং মামলার বিবাদী এখনো মুসলিম আছেন কি না? আদালত প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শেষ করার পরে শরিয়াহ তদন্তের জন্য দুই জন বিজ্ঞ আলেমের একটি কমিশন গঠন করে মামলাটি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে স্থানান্তর করে।
কোর্টের নির্ধারিত আলেম দুজন হলেন রাজ্যের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম শায়খ গোলাম মুহাম্মদ
আর অপরজন হলেন মাওলানা মুহাম্মদ সাদিক ।
মামলা ট্র্যান্সফার করা হয় ভাওয়ালপুর বিভাগীয় আদালতে।
২১ নভেম্বর ১৯২৮ ঈ.। দীর্ঘ এক বছর ছয় মাস পর কোর্ট বাদী এলাহী বখশের বিপক্ষে ফয়সালা দিয়ে মামলাটি খারিজ করে দিলো।
শায়খ গোলাম মুহাম্মদ ও মাওলানা সাদিক সাহেব নিজ দ্বায়িত্বে মামলা লড়ে গেলেন, ফের আপিল করলেন হাই কোর্টে। লাহোর হাই কোর্ট সাধারণ আইনে বাহ্যিক কাগজপত্র দেখে আবারো বিবাদী আবদুর রাজ্জাকের পক্ষে রায় প্রদান করে।
বাদী পক্ষের দুই ‘মাওলানা’ সহজে দমার পাত্র নয়, এযে পুরো উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যদি আহমদী আকিদার লোক আর একজন মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য না থাকে, যদি উভয়ের বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ বলে স্বীকৃতি পায় তাহলে কিছুদিন পর ইসলামের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর কাউকে নবী বলে মেনে নেয়া হয়, তাহলে সে এসে কোরআনে রদবদল করবে। হাদিসের ভান্ডারে ছুরি চালাবে। নামাজ,রোজা,হজ্জ, যাকাত, জিহাদ ইত্যাদি যেকোনো বিধানে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ইসলাম ধর্মের চেহারাই পাল্টে দিবে। তাই বাস্তবতা হলো খতমে নবুওয়ত (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী,তার পর কোন নতুন নবী আসবে না) আকিদার অস্বীকার করা মানে ইসলামের মৌলিক বিধান অমান্য করা। নতুন নবী মেনে নেয়া অর্থ দ্বীনের ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়া।
শায়খ গোলাম মুহাম্মদ শরণাপন্ন হলেন স্টেট অব ভাওয়ালপুরের প্রধানমন্ত্রী সর্দার নবী বখশের কাছে। মামলার গুরুত্ব ও নাজুকতা বুঝিয়ে বললেন। অনুরোধ করলেন হাইকোর্টের মতামত থেকে অব্যাহতি পেতে, মামলাটি একটি বিশেষ আদালত হিসাবে বাহাওয়ালপুর রাজ্যের মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ সভায় স্থানান্তর করতে। (যে পরিষদ মানগত দিক দিয়ে ভাওয়ালপুর রাজ্যে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানে রয়েছে।) এবং বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের দলীল প্রমাণ শুনে এবিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য এবং রায়টি পুনর্বিবেচনা করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করার আবেদন করেন।
২১ ডিসেম্বর ১৯৩১ ঈ.। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ মামলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে মন্ত্রীসভার জরুরী বৈঠক ডাকলেন। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে শুরু হলো কোর্ট অব মিনিস্টার্স। বিবাদী পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত কাদিয়ানী দায়ী জালাল উদ্দিন শামস ও ব্যারিস্টার আসাদুল্লাহ খান।
বাদী পক্ষের প্রতিনিধি শায়খ গোলাম মুহাম্মদ ও মৌলানা মুহাম্মদ সাদিক।
শায়খ প্রায় একশো পৃষ্ঠার দলীল দস্তাবেজ তৈরি করলেন। তার কয়েকজন শাগরেদ রাতদিন মিলে মন্ত্রীসভার সদস্যদের জন্য আটটি কপি হাতে লিখে নিয়ে আসলেন।
সভাপতি বাদী পক্ষকে সংক্ষেপে তার দাবি ও প্রমাণ উত্থাপনের আবেদন করলেন। শায়খ দাঁড়ালেন, “মাননীয় আদালত! পবিত্র কোরআনের একেকটি পাতা সাক্ষ্য দেয় যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্তার ওপর নবুওয়ত এবং ওহীর ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটেছে।” (একথা শুনে সবাই একটু নড়েচড়ে বসলেন। খতমে নবুওয়তের ওপর বেশ কয়েকটি আয়াত প্রমাণ বহন করে ঠিক, তাই বলে প্রতি পাতায় তো এসম্পর্কিত আয়াত ....?)
সভাপতি সাহেব: তাই নাকি! তাহলে দয়া করে কোরআনের প্রথম পাতা থেকে একটি প্রমাণ দেখান তো হযরত।
শায়খ: বুক পকেটে রাখা কুরআন শরীফের ছোট্ট নূসখাটি বের করে তিলাওয়াত করা আরম্ব করলেন, আউযু বিল্লাহ.... বিসমিল্লাহ.... “আলিফ লাম মীম, যালিকাল কিতাবু ....” থেকে “ “ওয়াল্লাযিনা য়ু'মিনু না বিমা উনযিলা ইলাইকা ওয়া মা উনযিলা মিন কবলিক, ওয়া বিল আখিরাতি হুম য়ু কিনুন।” পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন।
এরপর ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন, “শেষ আয়াতে অাল্লাহ তায়ালা দুই ধরণের ওহীর ওপর ঈমান আনার কথা বলেছেন, এক.“মা উনযিলা ইলাইকা” অর্থাৎ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। দুই. “মা উনযিলা মিন কাবলিক” এখানে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের কথা বলা হয়েছে।
যদি নবীজির পর আর কোনো ওহী আগমণের সম্ভাবনা থাকতো তাহলে অাল্লাহ তায়ালা অবশ্যই ‘পরবর্তী ওহী’র আলোচনা করতেন। সুতরাং বুঝা গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পর আর কারো উপর ওহী আসবে না এবং নতুন কোনো নবীও আসবেন না।”
উপস্থিত সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সবাই বাহ বাহ দিতে লাগলো। একজন ইংরেজ মন্ত্রী বলে উঠলো: ইটস লজিক!
এভাবে দীর্ঘক্ষণ দলীল উপস্থাপন শেষে শায়খ গোলাম মুহাম্মদ বসলেন।
এবার বিবাদীর পালা।
সভাপতি সাহেব: আপনাদের কিছু বলার আছে?
নওজোয়ান ব্যারিস্টার ভড়কে গেল, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললো, “ মাননীয় আদালত! পবিত্র কুরআনের আয়াত “ওয়া বিল আখিরাতি হুম য়ু কিনুন” এর মধ্যে যে ‘আখিরাত’ এর উপর ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে, এই ‘আখিরাত’ শব্দ দ্বারা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী উদ্দেশ্য; সুতরাং তাঁর ওপরও ঈমান আনা জরুরি।”
সভায় উপস্থিত বিদগ্ধ ও শিক্ষিতসমাজ ব্যারিস্টারের এমন হাস্যকর দাবি শুনে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
শায়খ গোলাম মুহাম্মদ দাড়িয়ে গেলেন, “মাননীয় সভাপতি! কুরআন তাফসিরের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো, কুরআনের এক অংশ অপর অংশের ব্যাখ্যা করে থাকে। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আখিরাতের পরিচয় দেয়া হয়েছে। সুরা কাসাসের ৭৭ ও ৮৪ নং আয়াতে এবং সুরা আনকাবুতের ৬৪ নাম্বার আয়াতে পরকালের জীবনকে ‘আখিরাত’ বলে ব্যাক্ত করা হয়েছে। সুতরাং বিবাদী পক্ষের ব্যারিস্টার সাহেব যা বলেছেন তা নির্জলা মিথ্যাচার বৈ কিছু নয়।”
দীর্ঘ সময় জেরার পর বৈঠক বিরতি হলো। বিরতির ফাঁকে মন্ত্রী মহোদয়গণ উভয় পক্ষের দলীল-প্রমাণ, কাগজপত্র দেখে পরষ্পরের মধ্যে মতবিনিময় করে নিলেন।
আবার বসলো মজলিস, এবার সিদ্ধান্ত আসার পালা।
সভাপতি সাহেব: উভয় পক্ষের সাক্ষ্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, হাই কোর্ট এবং ভাওয়ালপুর ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অত্র মামলার রায় প্রদান করতে পরিপূর্ণ যাচাই-বাছাই ও যথাযথ বিশ্লেষণ করেনি, সুতরাং আদালতের সাবেক রায় মেনে চলতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। এবং এই কেসের বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করে ডিসট্রিক্ট ইন্ডিসিশন কোর্ট ভাওয়ালপুর কে বিশেষ অনুমতি দেয়া যাচ্ছে যে, এই মামলা দেশের বড় বড় আলেমদের সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নতুন করে পর্যালোচনা করা হোক এবং মামলার বিবাদীকেও নিজেদের অবস্থান বর্ণনার সুযোগ দেয়া হোক।
২৫ জানুয়ারি ১৯৩২ ঈ.। নওয়াব অব ভাওয়ালপুর স্যার সাদিক মুহাম্মদ আব্বাসী এই রায়ের কাগজে দস্তখত করেন। দেশের সকল মতাদর্শের বড় বড় আলেমদের কাছে পাঠানো হয় চিঠি। মামলার মোড় ঘুরে যেতে শুরু করে।
শেষ বয়সে উপনীত বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির অধিকারী শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী। ঢাভেল জামিয়া ইসলামিয়া থেকে অসুস্থতার কারণে ছুটি নিয়ে কয়েকদিনের জন্য এসেছিলেন দেওবন্দ। ফিরে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছেন, এমন সময় ভাওয়ালপুরের চিঠি এসে পৌছলো তাঁর কাছে। কালবিলম্ব না করে শায়খ রওয়ানা হয়ে গেলেন ভাওয়ালপুরের উদ্দেশ্যে।
১৯ আগষ্ট ১৯৩২ ঈ. শুক্রবার। পুরো ভারতবর্ষের চোখ এখন ভাওয়ালপুরের দিকে। শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী জুমআর পর এক হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য দিলেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে বললেন: “আমার কাছে একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে,যদি খতমে নবুওয়াত আকিদার সংরক্ষণ করতে না পারি তাহলে রাস্তার কুকুরও আমার চেয়ে ভালো।”
অতঃপর ২৫ তারিখ থেকে লাগাতার চারদিন কোর্টে খতমে নবুওয়াতের পক্ষে দলীল-প্রমাণ পেশ করলেন। তিনি যখন বক্তব্য দিতেন হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেত, হিন্দুরাও তার কথা শুনার জন্য দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে যেত। ২৯ তারিখ বাদী পক্ষের প্রতিনিধিকে জেরা করার সুযোগ দেয়া হলো।
কথা প্রসঙ্গে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নাম আসলে আল্লামা কাশ্মীরী বলে ওঠেন “গোলাম আহমদ জাহান্নামী।”
একথা শুনে জালাল উদ্দিন শামস বারবার বলতে থাকে আপনি আপনার কথা উইথ ড্র করুন। আনওয়ার শাহ কাশ্মীরীর মধ্যে হঠাৎ ঈমানী জযবা চলে আসলো। শান্তভাবে এগিয়ে গেলেন, তার কাঁধে হাত রেখে বলেন: “হাঁ হাঁ মির্যা গোলাম আহমদ জাহান্নামী হ্যায়, দেখনা চাহতে হো কেহ ওহ জাহান্নাম মে কেয়ছে জল রহা হ্যায়?” (দেখতে চাও সে জাহান্নামে কিভাবে জ্বলছে?)
এতে জালাল উদ্দিনের চেহারা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে ঢোক গিলে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিল, যদি আপনি দেখিয়েও দেন তো আমি একে স্রেফ জাদু বলবো।
৩১ আগষ্ট ১৯৩২ ঈ.। সকল সাক্ষীর বক্তব্য রেকর্ড করা শেষ হলো। শায়খ কাশ্মীরী ঢাভেলে চলে যাওয়ার জন্য বের হবেন, এমন সময় শাগরেদ মাওলানা মুহাম্মদ সাদিক সাহেবকে ডেকে পাঠালেন। সাদিক সাহেবের কাছ থেকে মামলার রায় ঘোষণার তারিখ জানতে চাইলেন। তারপর (তারিখ এখনো নির্ধারিত না হওয়ায়) বললেন: “যদি ফয়সালা আমার জীবদ্দশায় হয়ে যায় তাহলে তো আমি নিজেই শুনে নিবো আর যদি ... যদি আমার মৃত্যুর পর রায় ঘোষণা হয় তবে আপনি আমার কবরে গিয়ে শুনিয়ে আসবেন।”
৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ ঈ.। কাদিয়ানী ধর্মমতের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আইনি রায় আসলো। দীর্ঘ নয় বছরের চেষ্টা কোশেশ সফল হলো। বিজয় হলো মুসলিম উম্মাহর। বিচারপতি মুনসি মুহাম্মদ আকবর খতমে নবুওয়াতের অস্বীকারকারীদের অমুসলিম ঘোষণা করলেন এবং মুসলিম মেয়েদের সাথে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের ফয়সালা করলেন।
মামলার বাদী এলাহী বখশের মেয়ে আয়শার সাথে বিবাদী আবদুর রাজ্জাক আহমদীর বিয়ের ডিভোর্সের মাধ্যমে এই মামলার সমাপ্তি হলো। কিন্তু কাহিনী এখনো শেষ হয়নি।
রায় ঘোষণার দুই বছর আগে ২৯ মে ১৯৩৩ ঈ. তারিখে ইন্তেকাল করেন এ মামলার অন্যতম যুদ্ধা শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী। এই কেসে শুরু থেকে লড়ে যাওয়া মাওলানা মুহাম্মদ সাদিক সাহেব ভুলে যাননি বিদায়কালে শায়খের সেই আদেশ। ( “আগর মেরে মরনে কে বাদ ফয়সালা হো, তো মেরি কবর পর আ কর সুনা দেনা” )
১৯৪৫ সাল। ঐতিহাসিক ভাওয়ালপুরের মামলার দশ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। মাওলানা মুহাম্মদ সাদিক সাহেব রওয়ানা হয়েছেন আজ দেওবন্দের পথে। যে মাটিতে সমাধিত হয়ে আছেন শায়খ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ.।
কয়েকদিন ধারাবাহিক সফরের পর গিয়ে পৌঁছলেন সাহারানপুর রেলস্টেশন। সোজা গিয়ে পরিস্থিত হলেন দেওবন্দ মাদরাসায় হুসাইন আহমদ মাদানীর কাছে। সালাম দিয়ে আরয করলেন, হযরত! স্থানীয় একজন ছাত্র দিন, যে আমাকে কাশ্মীরী রাহ. এর কবর দেখিয়ে দিবে। প্রায় মিনিট দশেক হাঁটার পর চলে আসলেন কাঙ্খিত গন্তব্যে। দেওবন্দ ঈদগাহের ময়দানের দক্ষিণ পাশে কবরস্থানে প্রবেশ করলেন।
আস সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর বলে সালাম পেশ করে ব্যাগ থেকে কাগজ বের করলেন, অশ্রুসিক্ত নয়নে মামলার রায় আদ্যোপান্ত পড়ে গেলেন , চোখের পানি গড়িয়ে দাড়ি ভিজে যাচ্ছে, চশমা খুলে চোখ মুছে নিচ্ছেন আর মাওলানা মুহাম্মদ সাদিক ঘোষণা করে যাচ্ছেন খতমে নবুওয়াতের বিজয়বার্তা।
এভাবে কোর্ট থেকে কবর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে এই উম্মাহর জন্য স্মরণীয় একটি মামলার দাস্তান। এই মামলার পর ড. ইকবাল রাহ. কাদিয়ানীদের সংখ্যালঘু হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলেন। পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি উঠলো। এবং এই মামলার দলীল প্রমাণ অনেক বড় ভূমিকা রাখে পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার ক্ষেত্রে। শত কষ্ট আর ধৈর্যের সাগর পাড়ি দিয়ে এভাবেই ঘটেছিল খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের জাগরণ।
কোর্ট থেকে কবরে, সত্য ঘটনা অবলম্বনে - হায়দার আলী।
About the Author
Hello Friends. Welcome to my website. I hope you all are doing good. If you like our work. Please revisit again. And do like and follow our blogs.
I Enjoy Writing, Drawing, And Self-taught.
