পলাশী থেকে বাংলাদেশ
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন জাতীয় বেঈমানদের চক্রান্তে বাংলার শেষ স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল পলাশীর আম্রকাননে। দু‘শ বছর ধরে বাংলার মানুষ আর সেই সূর্যোদয় দেখেনি। তৎকালীন বাংলার ৪ কোটি মানুষের জীবন ঘিরে নেমে এসেছিল দু:খ, দুর্দশা, লাঞ্ছনা, নির্যাতনের কাল অমাবস্যা। মীরজাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, ঘসেটি বেগম প্রমূখ নির্বোধ, পরপদলেহী, বিশ্বাসঘাতক, সভাসদ, আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবীরা ব্যক্তিস্বার্থউদ্ধারের বশবর্তী হয়ে জন্মভূমির স্বাধীনতা তুলে দিয়েছিল বিদেশী বেনিয়া ইংরেজদের হাতে। শুধু স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তার সাথে বাংলার ঐশ্বর্য, শিল্প-ব্যনিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতি ধ্বংস করে সেদিনের প্রকৃত সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করেছিল। ২৩ জুন তারিখটা আজও বাংলার বাংলার মানুষের কাছে কালরাত্রির বিভীষিকা, মহাশ্মশানের প্রেতচ্ছায়ার মত ভয়াবহ এক স্মৃতি। কালরাত্রির সেই ভয়াবহতা কাটিয়ে নবারুনরাগে রন্জিত হওয়ার আশ্বাস ব্যক্ত করে, কবি শ্রেষ্ঠ কাজী নজরুল ইসলাম তাই বলেছিলেন “উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার”।দু’শ বছর ধরে বাংলার মানুষ খুন ঝরিয়েছিল অঢেল। কবির নজরুলের আশ্বাসবাণী ‘উদিবে সে রবি আমাদের খুনে রাঙিয়া পুনর্বার’ সফল করে পূর্বদিগন্তে সূর্যোদয়ের আভাও দেখা দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল পলাশীর আম্রকানন থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে মেহেরপুরের আম্রকাননের ভবেরপাড়া গ্রামের দিগন্তে লাখো শহীদের খুনে রাঙা রক্তিম স্বাধীনতা সূর্যটা ডানা মেলেছিল, কিন্তু সেই সূর্যের উত্তাপ জনগণের কাছে পৌঁছানর আগেই ২৩শে জুনের প্রেতচ্ছায়ারা কালো ডানা বিস্তার করে ঢেকে দিল নব স্বাধীনতা সূর্যের সবটুকু লালিমা। আবার শুরু হল অন্ধকারের যাত্রা। লাখো শহীদের রক্তদান বৃথা হয়েগেল। চাষীর ৫ টাকার লুঙ্গী পরার সাধ পূরণ হলনা, মজুরের ২০টাকা মন চাল খাওয়ার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হল।
প্রথম রজনীতেই বাংলাদেশের কৃষক, মজুর, ছাত্র, ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতার সবটুকু অর্জন তুলে দেয়া হল লুটেরা ভারতীয় সেনাদের হাতে। ফলে যা হবার তাই হল। ‘হাজার সালকা বদলা’ নেয়ার আনন্দে আত্মহার হয়ে ভারতীয় লুটেরারা লুটপাট চালালো সারা দেশে। পাকিস্তান বাহিনীর ফেলে যাওয়া কোটিকোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র, মার্কেটের সোনা রূপা, টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ, কলকারখানার মেশিনের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে বাথ রুমের ফিটিং, দরজা জানালার দামী পর্দা পর্যন্ত কিছুই বাদ পড়লোনা বর্গীলুটেরাদের হাত থেকে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিল রুখে দাঁড়ালেন লুটপাটের বিরুদ্ধে, তাঁকে জেলে ভরা হল।
এই লুটপাটের কাহিনী, পলাশী যুদ্ধে সিরাজের পতনের পর, ক্লাইভ, ড্রেক, ওয়াটসন, কিলপ্যাট্রিক এবং তাদের সহযোগীদের মুর্শিদাবাদ লুণ্ঠনের কাহিনীকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। মীরজাফর নবাব হয়ে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনে ইংরেজদের যেমন সহায়তা করেছিলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ সরকারও তেমনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভারতীয় লুণ্ঠন অবলোকন করেছিলেন— প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন।
পলাশী যুদ্ধের পর ইঙ্গ-হিন্দুদের লাগামহীন লুণ্ঠনের ফলে, সমৃদ্ধ বাংলার বুকে নেমে এসেছিল ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের’ মত মহাদূর্ভিক্ষ, যে দূর্ভিক্ষে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়।
একইভাবে ১৯৭১সালের যুদ্ধের পর ভারত-আওয়ামীলীগ যৌথ লুণ্ঠনের ফলে বাংলাদেশে, পাকিস্তানের রেখে যাওয়া মজবুত অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ৭৪ রে দেখা দেয় আর এক মহাদূর্ভিক্ষ। যে দূর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়, পথে পথে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
পলাশী যুদ্ধের পর মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিকল্পিত ভাগে ধ্বংসকরে তাদের কুলী-কামীনের জাতে পরিণত করার জন্য, মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত ১ লাখ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজার হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এবং বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল।
তেমনি ১৯৭১ সালের পর ভারতীয় শিক্ষা উপদেষ্টার উপদেশ মত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার শিরদাঁড়া গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য রাজনীতিবিদরা ভারতের কথা মত, দেশের অভিজ্ঞ, যোগ্য, শিক্ষকমণ্ডলীকে নানান অজুহাতে বিতাড়িত করে তাঁদের জায়গায় দলবাজিতে পারঙ্গম, অনভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়োজিত করেছিল। এইসব অযোগ্য শিক্ষকরা স্বপদে বহাল থাকার জন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি শুরু করে, ছাত্রদের নিজদলে রাখার পন্থা হিসাবে তাদের হাতে অস্ত্র রাখতে সহায়তা করে, তাদের দিয়ে মিটিং করায়, প্রতিদানে ছাত্রদের অন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নিতে হয়। এধরনের দাবী মানতে গিয়ে শর্টকোর্স পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে হয়েছিল, ফলে পরিশ্রমের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন নয়, ফাঁকি দিয়ে ডিগ্রী অর্জনের প্রবণতা বেড়ে যায়, শুরু হয় গণটোকাটুকির মহোৎসব, আসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের নব নব কৌশল, যার বিষ থেকে বাংলাদেশ আজও মুক্ত হতে পারেনি । নব্য মীরজাফরের দল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলে। সেকালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিদ্যালয়ের ডিগ্রীর দাম আজ বিশ্বের কোথাও দাম নেই। এমনকি এশিয়ার ১০০টি প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোন নাম নেই।
পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফর যেমন কলকাতার অধিকার ক্লাইভের হাতে তুলে দিয়েছিল।
৭১ এর যুদ্ধের পর আওয়ামীলীগ গোটা বাংলাদেশটাই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে । নদীর পানি দিয়েছে, সমুদ্রের গ্যাস দিয়েছে, দু’টো বন্দর দিয়েছে, দেশের এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত যাতায়াতের পথ দিয়েছে। দেশের সমুদ্র উপকূল পাহারার দায়িত্ব দিয়েছে। বাকি থাকল কি?
১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের পর যেমন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছিল। কৃষকদের নির্যাতন করে নীলচাষে বাধ্য করা হয়েছিল। মসলিন তাঁতীদের আঙুল কেটে পঙ্গু করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর বাংলাদেশেও তেমনি আইন শৃঙ্খলা বলতে কিছু কিছু ছিলনা। খবরের কাগজের শিরোনামে লেখা হত “এবার কারফিউ দিয়ে লুট”। “৯মাসে রংপুরে ৩০২ টি খুন, ২২৬টি ডাকাতি”। “হত্যা, লুট, ধর্ষণ,হয়রানি, ডাকাতদের ভয়ে গ্রামবাংলার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে শরণার্থী সেজেছে” ইত্যাদি।
আজও ৭১এর প্রেতাত্মা আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। আজও দেশে হত্যা, ধর্ষণ, খুন, গুমখুন, রিমান্ডে নিয়ে পঙ্গু ,লুটপাট, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কাস্টডিতে নিয়ে খুন ,ক্রসফায়ার খুন, এনকাউন্টারসহ খুনের যে কত ধরণ, প্রকার ও কী কী, বাংলাদেশে পা না দিলে বোঝা যাবেনা। দেশে বিচার ব্যবস্থা পঙ্গু।
তার উপর টাকা পাচার। পত্রিকার খবর অনুযায়ী ২০১৫ সালেই দেশ থেকে পাচার হয়েছে ১লাখ কোটি টাকার বেশি (যুগান্তর৭.৬.২২) জি এফ আই এর রিপোর্ট অনুযায়ী ৪লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে দেশ থেকে। আর এসবই আওয়ামী মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় আর পাণ্ডাদের কীর্তি।
২৩ শে জুনের কালো দিনে জন্মগ্রহনকারি আওয়ামীলীগ দলটির আচার আচরণ কর্মসূচী কোনদিনই স্বদেশমূখী ছিলনা, আজও নেই।
তুলনামূলক আলোচনা করলে পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফর বাংলার যা ক্ষতি করেছিল, আওয়ামীলীগ কর্তৃক বাংলাদেশের ক্ষতি পরিমাণ তুলনা করলে সেটা মীরজাফরকে ছাড়িয়ে যাবে একহাতে উন্নয়নের জপমালা অন্য হাতে গলাকাটার ছুরি, এই চিত্রই আওয়ামীলীগের বাহাদূরী।
