নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা থেকে ধর্মশিক্ষা বাদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনপ্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৩০ মে, ২০২২। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ রূপরেখার কোনো স্তরে ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মূল্যবোধ ও নৈতিকতা দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাক্রমে রাখা হলেও তা হবে সেকুলার। কোনোক্রমে ধর্মশিক্ষা নয়। দেশের নানা জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধর্মশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না, এটা একটি স্বাধীন ও মর্যাদাবান জাতির জন্য কেবল বেদনাদায়ক নয়, লজ্জাকরও বটে। যেকোনো ধর্মবিশ্বাসী মানুষ চায়, তার সন্তান যথাযথভাবে ধর্মশিক্ষা লাভ করুক। তাদের সন্তানরা ধর্মহীন হয়ে বেড়ে উঠুক, তারা কোনো দিন চান না। ধর্মচর্চা করা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। ধর্মীয় শিক্ষা ও জ্ঞান না থাকলে ধর্মপালন করবে কী করে? পরিসংখ্যান মতে, তিন কোটি শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যায়। এর মধ্যে ৫০ লাখের মতো শিক্ষার্থী আলিয়া ও কওমি মাদরাসায় অধ্যয়ন করে। বাকি দুই কোটি ৫০ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে পড়ে। দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ার পর এসব শিক্ষার্থী বিশেষায়িত সাবজেক্টে ও ডিসিপ্লিনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে। সুতরাং সরল সমীকরণ, এসব শিক্ষার্থী পুরো শিক্ষাজীবনে ধর্মশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল। বাস্তব জীবনে এসে ধর্মচর্চা করার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০-৩০ বছর শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ধর্মপরায়ণ মানুষের সংখ্যা কমবে আশঙ্কাজনক হারে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে দুই মন্ত্রণালয়ের এনসিসিসিতে অনুমোদন দেয়ায় এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ১০ ধরনের শেখার ক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলো ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের আলাদা বই থাকবে না, শিক্ষকরাই শেখাবেন। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে এখন থেকে শিক্ষার্থীরা দশম শ্রেণী পর্যন্ত অভিন্ন সিলেবাসে পড়বে। আর শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, মানবিক না বাণিজ্য বিভাগে পড়বে, সেই বিভাজন হবে একাদশ শ্রেণীতে গিয়ে। নতুন শিক্ষাক্রমে এখনকার মতো এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে না। শুধু দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে হবে এসএসসি পরীক্ষা। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে দু’টি পাবলিক পরীক্ষা হবে। প্রতি বর্ষ শেষে বোর্ডের অধীনে এ পরীক্ষা হবে। এরপর এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চ‚ড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো: আবু বকর ছিদ্দীকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যৌথসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। বৈঠকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আমিনুল ইসলাম খানসহ এনসিসিসির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন (প্রথম আলো, যুগান্তর, ৩০ মে, ২০২২)।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সাতটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে ধর্মীয় শিক্ষাকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। বর্তমান শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি ১৯৭৪ সালের কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন, ১৯৯৭ সালের শামসুল হক শিক্ষা কমিশন এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ কমিটির প্রতিবেদনকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়েছেন (পৃষ্ঠা-২)। অথচ কুদরত-এ খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাব ছিল ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা ও উপহাসের বহিঃপ্রকাশ। আসলে কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন ইসলামী আদর্শ বিরোধী এক কালো দলিল। এ রিপোর্ট ছিল তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক দীনতার এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এ কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাবের প্রতিফলন দেখে অনেকে বিস্মিত না হলেও হতাশ হয়েছেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আদর্শিক নৈতিকতা থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দূরে সরিয়ে রেখে একটি ধর্মবিবর্জিত ‘ইহ-জাগতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল’ তৈরির উপযোগী জনবল সৃষ্টিই বর্তমান শিক্ষা কমিটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
‘২০১০ সালে প্রণীত সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রধানমন্ত্রী ধর্ম, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। এ নীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২। কিন্তু ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতি, জাতীয় শিক্ষাক্রমে প্রতিফলিত হয়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২-এ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ইসলামী শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়েছিল। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শাখা থেকে ইসলামী শিক্ষাকে পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়েছিল। আর বর্তমানে মানবিক শাখায় ইসলামী শিক্ষাকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ শিক্ষা কলেজগুলোতে অবহেলিত অবস্থাতেই পড়ে আছে। এতে কলেজের ইসলামী শিক্ষার শিক্ষকরা ঐচ্ছিক বিষয়ের একজন গুরুত্বহীন শিক্ষকে পরিণত হয়ে আছেন। অন্য দিকে এ বিষয়ের ছাত্রসংখ্যাও আস্তে আস্তে লোপ পেতে পেতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অথচ ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষেও কলেজগুলোতে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসা- সব শাখার শিক্ষার্থী ইসলামী শিক্ষাকে আবশ্যিক সাবজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করত। আবার প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২০-এ ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ বিষয়টিকে দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল।
প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, দশম শ্রেণীর বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়গুলোর বোর্ড পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এসব বিষয়ের ক্লাস-পরীক্ষা নিয়মিত চালু থাকবে। বিষয়গুলোর সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে। এ মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই একজন শিক্ষার্থীর গ্রেড নির্ধারিত হবে। এ প্রস্তাবে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’কে গুরুত্বহীন হিসেবে বোর্ড পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়েছিল। এর মানে দাঁড়ায়, ‘ইসলামী শিক্ষা’ বিষয়ে গ্রেড উন্নয়নে শিক্ষার্থীদের পড়ার দরকার হবে না। শিক্ষকদেরও ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণের তেমন কোনো আগ্রহ থাকবে না। কারণ শিক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষা ছাড়া এটি পড়তে কখনোই আর আগ্রহী হবে না। আর শিক্ষকরাও এ বিষয়ে ক্লাস নিতে আর কোনো গুরুত্ব দেবেন না। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতিতে সুস্পষ্টভাবে এ কথা উল্লেখ ছিল, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করা’। কিন্তু এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষানীতিতে উল্লিখিত শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অমান্য ও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে সম্পূর্ণভাবে ‘ইসলামী শিক্ষা’ বিষয়টিকে বাদ দেয়া হয়েছে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো যে, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য প্রতিফলনের কোনো ব্যবস্থা ২০২০-এর শিক্ষাক্রমে রাখা হয়নি! আর শিক্ষানীতিতে ঘোষিত শিক্ষার্থীদের নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত চরিত্র গঠনের যে কথা বলা হয়েছে, সেটিও জাতীয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। অর্থাৎ স্কুল ও কলেজে ‘ইসলামী শিক্ষা’ বিষয়ে পড়াশোনার আর কোনো সুযোগ নেই’ (প্রফেসর ড. মো: কামরুজ্জামান, ইনকিলাব, ঢাকা, ১১ জুন, ২০২২)।
২০২৭ সালের মধ্যে বর্তমান শিক্ষা রূপরেখা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। স্বাভাবিক কারণে পুরো জাতি এতে শঙ্কিত। আমাদের বিবেচনায়, এ রূপরেখাতে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, লালিত সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকার ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটেনি। বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিমপ্রধান দেশ। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ধর্মপরায়ণ ও অসা¤প্রদায়িক। শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মশিক্ষা সঙ্কোচন জনগণ সহজে মেনে নেবেন না। ধর্মবিবর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ দেশ ও জাতির জন্য সমূহ বিপর্যয় ও অকল্যাণ বয়ে আনবে। এ রকম শিক্ষাধারা হবে বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ। মুসলমানদের ইসলাম ধর্ম, হিন্দুদের সনাতন ধর্ম, বৌদ্ধদের বৌদ্ধধর্ম, খ্রিষ্টানদের খ্রিষ্টধর্ম, পাহাড়িদের নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ধর্মশিক্ষা, চর্চা ও প্রচার করার অধিকার থেকে রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে বঞ্চিত করতে পারে না। আমাদের জানা মতে, শিক্ষা রূপরেখা প্রণয়ন কমিটি সেকুলার শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ ও মতামত নিলেও ইসলামী বিষয়ে পারদর্শী আলেম বা ইসলামিক স্কলারদের কোনো বক্তব্য বা মতামত গ্রহণ করেনি; ফলে নতুন শিক্ষা রূপরেখাটি হয়ে পড়েছে একদেশদর্শী, অপূর্ণাঙ্গ ও খণ্ডিত। জাতীয় শিক্ষা রূপরেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল প্রণয়নে যেভাবে ব্যাপকভিত্তিক মতামত নেয়া দরকার ছিল, তা করা হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সুপারিশ অনুযায়ী, এ শিক্ষা চালু হলে পুরো জাতি দ্রুত আদর্শিক মূল্যবোধবিবর্জিত অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো: কামরুজ্জামান বলেন, মূলত ইসলামী শিক্ষার প্রতি একটি মহলের কুদৃষ্টি সৃষ্টি হয়েছে ২০০১ সাল থেকে। এ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি মহল ইসলামী শিক্ষাকে ধ্বংসের পাঁয়তারা শুরু করেন। দশম শ্রেণীর ১০টি সাবজেক্টের কোনোটিতে তারা হাত দেননি। তারা হাত দেন ১০০ নম্বরের ‘ইসলামী শিক্ষা’র প্রতি। তারা ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষাকে ৫০ নম্বরে সঙ্কুচিত করার হীন প্রয়াস শুরু করেন। দেশের সবাই জানেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজ শুধু নির্বাচন পরিচালনা করা। তিন মাসের জন্য ক্ষমতায় থাকা সরকারের এ বিষয়ে নাক গলানোর কথাই নয়। কিন্তু ওই সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ইসলামবিদ্বেষী কিছু ব্যক্তি এ শিক্ষা নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষার প্রতি তাদের গাত্রদাহ শুরু হয়। পরবর্তীতে ধর্মীয় জনতার প্রতিবাদে তারা সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ইসলামী শিক্ষা নিয়ে এ ষড়যন্ত্র সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। অন্য কোনো শিক্ষা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ও ষড়যন্ত্র নেই। যত মাথাব্যথা ও ষড়যন্ত্র শুধু ইসলাম ধর্ম আর ‘ইসলামী শিক্ষা’ নিয়ে। ষড়যন্ত্রের এ ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে শুরু হয় স্কুলের ‘ইসলামী শিক্ষা’ নিয়ে নতুন কারসাজি। এ সময় ‘ইসলাম শিক্ষা’ বইয়ের নাম পরিবর্তন করা হয়। নতুন নাম দেয়া হয় ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’। অথচ হিন্দুধর্ম শিক্ষা ও খ্রিষ্টান ধর্ম শিক্ষা বইতে এ রকম কোনো নাম দেয়া হলো না। এখানে প্রচ্ছন্নভাবে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ দুটো নামের মাঝখানে ‘ও’ অব্যয় দিয়ে দুটো ভিন্ন জিনিস বোঝানো হলো। আর উভয়ের মধ্যে বিরোধ আছে মর্মে একটি কারসাজির বীজ বপন করা হলো। কারসাজির এ সূত্র ধরে দুষ্টচক্রটির পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল এ শিক্ষাকে পাঠ্যসূচি থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেয়া। চক্রটি তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে শতভাগ সফল হলো। বর্তমানে ২০২২ সালের শিক্ষাক্রমে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ নামক বইটি সিলেবাস থেকে বাদ দিয়ে দিলো (ইনকিলাব, ঢাকা, ১১ জুন, ২০২২)।
এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার লেখক শিক্ষার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘একটি সমাজের পুঞ্জীভূত জ্ঞান ও মূল্যবোধের হস্তান্তর হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য’। আধ্যাত্মিক, মানবিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতিই শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত। ঐশী চেতনায় লালিত আদর্শ ও মূল্যবোধ ছাড়া শুধু ইহজাগতিক ও বস্তুতান্ত্রিক উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো আদর্শ ও সৎ নাগরিক তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। পাশ্চাত্যে প্রচলিত আদর্শিক মূল্যবোধবিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক স্খলন রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। বর্তমানে অনুমোদিত শিক্ষা রূপরেখা ধর্মশিক্ষাকে সামগ্রিকভাবে অনাবশ্যক গণ্য করে কালান্তরে এর অস্তিত্ব বিনাশ করে দেবে। লর্ড মেকলে বা ওয়ারেন হেস্টিংস যা করেননি বা করতে পারেননি, এ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তা পুরোপুরি কার্যকর হবে। বর্তমান শিক্ষার রূপরেখার সাথে আমাদের সমাজ ও সাংস্কৃতিক বোধের সম্পর্ক নেই। স্কুল-কলেজে ধর্মশিক্ষা তুলে দিলে মানুষ ধর্মবিমুখ নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা থেকে ধর্মশিক্ষা জীবনবিমুখ ও সমাজবিমুখ হয়ে পড়বে। জনগণের বিশ্বাস ও বোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন কোনো শিক্ষা রূপকল্প চলতে পারে না।
আমরা প্রস্তাব করছি নৈতিকতাসম্পন্ন জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। ধর্মশিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আবশ্যকীয় করতে হবে। আমরা সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে আমাদের শঙ্কা, সংশয়, প্রস্তাব ও দাবিগুলো যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করার আবেদন জানাই। একইসাথে জনগণকে ধর্মীয় শিক্ষা ও জাতীয় মূল্যবোধপরিপন্থী এ শিক্ষা রূপরেখা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই।
নতুন শিক্ষাক্রম অনুমোদন দিয়েছে সরকার, বাদ দেওয়া হয়েছে ধর্ম শিক্ষা
এক পলকে দেখে নিন পুরোটা:◾২০২৩ সাল থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে (শুক্র ও শনিবার) দু’দিন ছুটি থাকবে।
◾ পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, দশম শ্রেণির আগে কোনো কেন্দ্রীয় বা পাবলিক পরীক্ষা নেই।
◾ তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্তও কোনো পরীক্ষা থাকবে না।
◾চতুর্থ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০ আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
◾ বিজ্ঞান, মানবিক ও বিজনেস স্টাডিজ বলতে মাধ্যমিকে কোনো বিভাগ থাকবে না। এটি চালু হবে এইচএসসিতে।
◾ দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির উপরই বোর্ড পরীক্ষায় এসএসসির ফল হবে।
◾ প্রাক্-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য আলাদা বই থাকবে না, শিক্ষকেরাই শেখাবেন।
◾ প্রাথমিকে পড়তে হবে আটটি বই।
◾ নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১০ ধরনের শেখার ক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছে। এগুলো হলোঃ-
১) ভাষা ও যোগাযোগ,
২) গণিত ও যুক্তি,
৩) জীবন ও জীবিকা,
৪) সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব,
৫) পরিবেশ ও জলবায়ু,
৬) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,
৭) তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি,
৮) শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা,
৯) মূল্যবোধ ও নৈতিকতা
১০) শিল্প ও সংস্কৃতি
যা যা বাদ দেওয়া হয়েছে:
📖 Class two এর বই থেকে প্রিয় নবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী বাদ দিয়েছে।📖 Class three এর বই থেকে খলিফা আবু বক্কর এর জীবনী বাদ দিয়েছে।
📖 Class four এর বই থেকে খলিফা ওমর (রা) এর জীবন বাদ দিয়েছে।
📖 Class five এর বই থেকে নবীজির বিদায় হজের ভাষণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বাদ দিয়েছে পাশাপাশি সংযুক্ত করেছে বই নামের একটি কবিতা যা কোরআন শরীফ বিরোধী।
📖 Class six এর বইতে সংযুক্ত করেছে লাল গরু নামের একটি গল্প যা মুসলিমদের বাধ্য করছে গরুকে মা বলে সম্বোধন করতে পাশাপাশি শিক্ষা দিচ্ছে গরু জবাই করা একটি মহা অন্যায়।
📖 Class seven এর বই তে সংযুক্ত করেছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখিত লালো নামের একটি গল্প যা মুসলিমদের কালী পূজা করতে উদ্বুদ্ধ করছে।
📖 Class eight এর বই তে আরো সংযুক্ত করা হয়েছে হিন্দুদের রামায়ণ নামের গ্রন্থ যা সরাসরি মুসলিমদের হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করছে।
👳♂️একজন মুসলিম হিসাবে এই সকল মুসলিম বিদ্বেষী কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।👎
একটি মুসলিমপ্রধান দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কাদের হাতে চিন্তা করা যায়?
১. প্রাথমিক শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শ্যামল কান্তি ঘোষ।২. পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সচিব বজ্র গোপাল ভৌমিক।
৩. কারিগরি শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জনাব অশোক কুমার বিশ্বাস।
৪. সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) যুগ্ম পরিচালক রতন কুমার রায়।
৫.সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) বিশেষজ্ঞ ডঃ উত্তম কুমার দাশ।
৬. ঢাকা বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক অদ্বৈত কুমার রায়। ৭. চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব ড. পীযুষ কান্তি দন্ত।
৮. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র ঢালী।
৯. বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়্যারম্যান নারায়ন চন্দ্র পাল।
১০. ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ্র।
১১. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব অজিত কুমার ঘোষ।
১২. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পতিত পাবন দেবনাথ।
১৩. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব অসীম কুমার কর্মকার।
১৪. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-প্রধান স্বপন কুমার ঘোষ।
১৫. শিক্ষামন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব শ্রী বনমালী ভৌমিক।
১৬. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. অরুণা বিশ্বাস।
১৭. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমার সরকার।একটি মুসলিমপ্রধান দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কাদের হাতে চিন্তা করা যায়।এরা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি ইসলামকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।😭
